কীভাবে নিজের ঠিকানায় ফিরে আসে কবুতর, জানুন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
শত শত কিলোমিটার দূর থেকে উড়ে এসেও নিজের ঠিকানায় ফিরে যেতে পারে কবুতর। শুধু কবুতরই নয়, সামুদ্রিক কচ্ছপ, তিমি, বাদুড়সহ আরও অনেক প্রাণী পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে দিক নির্ণয় করে বলে ধারণা করেন বিজ্ঞানীরা। তবে এই অদৃশ্য সংকেত তারা কীভাবে বুঝতে পারে, তা দীর্ঘদিন ধরেই ছিল রহস্য।
সম্প্রতি জার্মানির একদল গবেষক দাবি করেছেন, তারা এই রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র খুঁজে পেয়েছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, কবুতরের শরীরে থাকা বিশেষ ধরনের রোগপ্রতিরোধী কোষ পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র শনাক্ত করতে ভূমিকা রাখতে পারে। অবাক করার বিষয় হলো, এসব কোষ পাখির লিভারে অবস্থান করে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব অ্যানিম্যাল বিহেভিয়ারের পরিচালক মার্টিন উইকেলস্কি বলেন, প্রায় এক শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীরা প্রাণীদের চৌম্বক অনুভূতির রহস্য বোঝার চেষ্টা করছেন। নতুন গবেষণা সেই রহস্য উন্মোচনের পথে বড় অগ্রগতি হতে পারে।
পৃথিবীর অদৃশ্য দিকনির্দেশনা
পৃথিবীর গভীরে থাকা গলিত লোহা ও নিকেলের চলাচলের কারণে একটি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই মনে করতেন, পাখিরা এই চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে পথ খুঁজে নেয়। তবে শরীরের কোন অংশ এই সংকেত গ্রহণ করে, তা নিয়ে মতভেদ ছিল।
কেউ ধারণা করতেন চোখে এর রহস্য লুকিয়ে আছে, কেউ বলতেন ঠোঁটে, আবার অনেকে মনে করতেন কানের ভেতরের কোনো অংশ এতে জড়িত।
লিভারে পাওয়া গেল নতুন সূত্র
গবেষণার শুরু প্রায় এক দশক আগে। পাখিবিজ্ঞানী মার্টিন উইকেলস্কি ও রোগপ্রতিরোধবিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান কুর্টস এক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে আলোচনা করতে গিয়ে নতুন ধারণা পান।
কুর্টস তখন ম্যাক্রোফেজ নামে পরিচিত রোগপ্রতিরোধী কোষ নিয়ে কাজ করছিলেন। এই কোষ পুরোনো রক্তকণিকা ভেঙে ফেলার সময় প্রচুর আয়রন জমা করে। সেখান থেকেই প্রশ্ন ওঠে, আয়রনসমৃদ্ধ এসব কোষ কি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র শনাক্ত করতে পারে?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষকেরা কবুতরের চোখ, ঠোঁট, মস্তিষ্ক, প্লীহা ও লিভার পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় তারা লিভারে বিপুল পরিমাণ আয়রনসমৃদ্ধ ম্যাক্রোফেজ খুঁজে পান। আরও দেখা যায়, এসব কোষ স্নায়ুর খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে।
গবেষক ক্লিভিয়া লিসোভস্কির মতে, এতে ধারণা করা যায় যে ম্যাক্রোফেজ ও স্নায়ুকোষের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান হতে পারে।
পরীক্ষায় যা জানা গেল
গবেষকেরা ৩৪টি প্রশিক্ষিত কবুতরের ওপর পরীক্ষা চালান। এসব কবুতর প্রায় ১২ মাইল দূর থেকেও নিজেদের বাসায় ফিরে আসতে পারত।
পরীক্ষার এক পর্যায়ে বিজ্ঞানীরা কবুতরের লিভারের ম্যাক্রোফেজ কোষগুলোর কার্যকারিতা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেন। এরপর দেখা যায়, আকাশ মেঘলা থাকলে কবুতরগুলো আর সঠিকভাবে বাসায় ফিরতে পারছে না। তবে সূর্য দেখা দিলে তারা আবার পথ চিনে ফিরে আসে।
এ থেকে গবেষকদের ধারণা, কবুতর দিক নির্ণয়ে একাধিক উপায় ব্যবহার করে। সূর্যের অবস্থান দৃশ্যমান থাকলে তারা সেটিকে অনুসরণ করে, আর আকাশ মেঘে ঢাকা থাকলে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করে।
এখনও বাকি অনেক প্রশ্ন
তবে গবেষকেরা বলছেন, রহস্যের পুরো সমাধান এখনও মেলেনি। লিভারের ম্যাক্রোফেজ কোষ কীভাবে চৌম্বক ক্ষেত্র শনাক্ত করে বা কোন স্নায়ুর মাধ্যমে সেই তথ্য মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এ ছাড়া অন্য প্রাণীরাও একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করে কি না, সেটিও এখন গবেষণার বিষয়।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবপদার্থবিজ্ঞানী থরস্টেন রিটজের মতে, প্রকৃতিতে একই সমস্যার একাধিক সমাধান থাকতে পারে। কিছু প্রাণী হয়তো চোখের বিশেষ অণুর মাধ্যমে চৌম্বক ক্ষেত্র অনুভব করে, আবার অন্যরা লিভারের কোষ ব্যবহার করে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রাণীরা নিরাপদে পথ খুঁজে পেতে একাধিক ধরনের ‘জৈব কম্পাস’ একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারে। আর এই নতুন গবেষণা সেই জটিল ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক উন্মোচন করেছে।
প্রতি / এডি / শাআ









